পোস্টের কোড : 1980 11 পরিদর্শন

জীবনশৈলী (চতুর্থ পর্ব) : জীবনকে আরও সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া

জীবনকে আরও সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। মানবজীবনে ভুলত্রুটি অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়, তবে তারাই বুদ্ধিমান যারা জীবনের ভুলত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে পরবর্তীতে সেগুলো শুধরে নেয় এবং সামনের দিকে এগিয়ে চলে।


তবে তাদের চেয়েও বুদ্ধিমান হলেন তারা, যারা অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভুলত্রুটিমুক্ত জীবনযাপনের চেষ্টা করেন। আমাদের চারপাশে যা কিছু ঘটছে বা অতীতে যেসব ঘটনা ঘটেছে তার সব কিছুতেই আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় থাকতে পারে। প্রতিদিনের নানা ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে চাইলে এসব ঘটনাকে নিয়ে একটু গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে, সূক্ষ্ম দৃষ্টি দিয়ে ঘটনাকে দেখতে হবে। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-হাশরের  ২ নম্বর আয়াতের একাংশে বলা হয়েছে, হে সূক্ষ্ম দৃষ্টির অধিকারীরা তোমরা (অতীত থেকে) শিক্ষা গ্রহণ করো।  পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন সূরায় অতীতের বিভিন্ন ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে হজরত সুলাইমান (আ.)'র ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। হজরত সুলাইমান (আ.) বিপুল অর্থ-বিত্তের অধিকারী ছিলেন। জ্বিন জাতি ও পাখিরা তাঁর অধীনস্ত ছিল। তিনি জীব-জন্তুর ভাষা পর্যন্ত বুঝতে পারতেন। কিন্তু বিপুল অর্থ-বিত্ত ও ক্ষমতা তাকে বিভ্রান্ত করতে পারে নি।

হজরত সুলায়মান (আ.) সব সময় আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করেছেন এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। কুরআনে লুত (আ.)'র জাতির অন্যায়ের শাস্তির কথা এসেছে। ওই জাতি আল্লাহকে ভুলে গিয়ে অন্যায় কাজে লিপ্ত হয়েছিল। এ কারণে তাদের ওপর কঠিন শাস্তি নেমে এসেছিল। কুরআনে হজরত মূসা (আ.) ও ফেরাউনের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে যা সত্যিই আকর্ষণীয়। এছাড়াও নবী-রাসূলদের অনেক ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে যাতে মানুষ শিক্ষা নিতে পারে। কুরআনে এসব ঘটনা তুলে ধরার উদ্দেশ্য কখনোই স্রেফ গল্প বলা নয় বরং এসব গল্পের মাধ্যমে মানুষকে সঠিক পথের নির্দেশনা দিয়েছেন মহান আল্লাহ। এ কারণে পবিত্র কুরআনে নবী-রাসূলদের এমন কোনো অগুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করা হয় নি যেখানে দিকনির্দেশনা নেই। এ কারণেই কুরআনে নবী-রাসূলদের ঘটনা বর্ণনা করার সময় জন্ম ও মৃত্যু তারিখ, নবীদের সন্তান ও স্ত্রীর সংখ্যার মতো তথ্য তুলে ধরা হয় নি। 

কুরআনে বর্ণিত বিভিন্ন ঘটনার একটি হচ্ছে হজরত ইউসুফ (আ.)'র ঘটনা। সেখানে আল্লাহ স্পষ্টভাবেই শিক্ষা নেওয়ার কথা বলেছেন। পবিত্র কুরআনের সূরা ইউসুফের ১১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তাদের এ কাহিনীগুলোতে অবশ্যই বুদ্ধিমানদের জন্য শিক্ষা রয়েছে। সূরা ইউসুফে রয়েছে দশটি শিক্ষা। এর মধ্যে ভাইদের পক্ষ থেকে হিংসা-বিদ্বেষ ও এর ধ্বংসাত্মক পরিণতি, শত্রুদের নানা ষড়যন্ত্র ও প্রতারণা মোকাবেলা, ইউসুফ (আ.)'র নিষ্পাপ অবস্থা, যৌন লালসা ও পাপ থেকে দূরে থাকার প্রয়োজনীয়তা, জুলায়খার অপকর্ম ও ইউসুফ (আ.)'র পবিত্রতা অন্যতম। পবিত্র কুরআন এসব ঘটনা বর্ণনার মাধ্যমে মানুষকে এ বার্তাই দিচ্ছে যে, অতীত জাতিগুলোর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের বর্তমান জীবনকে সুন্দরভাবে সাজাতে হবে। সেসব ভুলের পুনরাবৃত্তি করা যাবে না।

জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে আর তাহলো পরামর্শ।  ইসলামে পরামর্শের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। মহানবী হজরত মোহাম্মাদ (স.) নিজে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে পরামর্শ করেছেন এবং পরামর্শের জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন। যাদের মধ্যে অহংকার ও আত্মম্ভরিতা নেই তারা সহজেই অন্যের কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু যারা অহঙ্কারী এবং নিজের সিদ্ধান্তকেই সর্বোত্তম বলে মনে করে তারা সাধারণত অন্যের সঙ্গে পরামর্শ করে না এবং অন্যের কাছ থেকে কোনো শিক্ষাও গ্রহণ করে না। সাফল্য অর্জন বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মানুষের ব্যর্থতার পেছনে অনেক কারণ থাকে। তবে অনেকের ব্যর্থতার পেছনের প্রধান কারণ হলো নিজেকে অন্যদের চেয়ে বড় মনে করা এবং অন্যের পরামর্শ গ্রহণ না করা। অন্যের পরামর্শ গ্রহণের গুরুত্ব প্রসঙ্গে আমিরুল মুমিনিন হজরত আলী (আ.) বলেছেন, যারা অন্যের সঙ্গে পরামর্শ করেন এবং অন্যের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগান তারা সঠিকতর সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হন।

তবে হ্যা সবাইতো আর সঠিক পরামর্শ দিতে পারে না। সে কারণে আমাদেরকে পরামর্শদাতা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে। আমরা ওই সব লোকের কাছেই পরামর্শ নেব যারা সৎ জ্ঞানের অধিকারী, সুবুদ্ধিসম্পন্ন, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও সুচিন্তার অধিকারী। বলা হয়ে থাকে, কোনো কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করার জন্য তিনজন বয়স্ক মানুষের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। ইরানি সমাজে প্রচলিত একটি কথা হচ্ছে, যে যত বেশি পরামর্শ করে, সে তত কম ভুল করে। একবার দুই ব্যক্তি নদীর পাড়ে বসে মাছ ধরছিল। দুই জনের একজনের বয়স ও অভিজ্ঞতা ছিল বেশি। অপর জন ছিল কম বয়সী।  মাছ ধরার অভিজ্ঞতাও তার খুব একটা ছিল না।

দুজনেই পাশাপাশি বসে নদীতে বড়শি ফেলেছে। কিন্তু বয়স্ক লোকটির বড়শিতে টপাটপ মাছ ধরলেও অল্প বয়সীর বড়শিতে একটি মাছও ধরা পড়লো না।  অল্প বয়সী লোকটি অভিজ্ঞ লোকটির কোনো পরামর্শ না নিয়ে ঘ্ন্টার পর ঘন্টা নদীর পাড়ে বসে থেকেও কোনো মাছই ধরতে পারলো না। সে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে গেল। যদিও বয়স্ক ও অভিজ্ঞ লোকটির বড়শিতে টপাটপ মাছ ধরার রহস্য খুব কঠিন কিছু ছিল না। বয়স্ক লোকটি যেখানে বড়শি ফেলেছিলেন সেখানে আগে থেকেই কিছু শুকনো রুটি রেখেছিলেন যেটাকে অনেকেই চার বলে থাকেন। বড়শি ফেলার আগেই খাবার দেওয়ায় সেখানে মাছ এসে জড়ো হয়েছিল এবং সেখানে জড়ো হওয়া ওই সব মাছ বড়শিতে দেওয়া আরও আকর্ষণীয় খাবার গিলছিল। এর ফলে বয়স্ক লোকটি অনেক মাছ ধরতে পেরেছিলেন। অল্প বয়সী লোকটি যদি পাশের লোকটির সঙ্গে এ বিষয়ে পরামরর্শ করতো তাহলে ঘন্টার পর ঘন্টা বিফলে যেত না এবং মাছ ধরার বিষয়ে হতাশাও আসতো না।

আমাদের জীবনটা এমনি। আমরা অনেক সময়ই অতীত ঘটনাবলী ও অভিজ্ঞতা কাজে না লাগিয়ে এবং অন্যের সঙ্গে পরামর্শ না করে ভুল পথ নির্বাচন করি। কেউ একবার ভুল পথ নির্বাচন করলে তা শোধরানোর জন্যও অন্যের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। এ কারণে আমরা যদি কখনো ভুল পথ নির্বাচন করে ফেলি তাহলে সে পথে অটল না থেকে তা শোধরানোর জন্য চেষ্টা করতে হবে। এ ক্ষেত্রেও অন্যের পরামর্শ প্রয়োজন হবে।

আমরা সবাই জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে অতীত থেকে শিক্ষা নেব এবং অন্যের সঙ্গে পরামর্শ করব-এ প্রত্যাশায় শেষ করছি আজকের আসর।

0
সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে শেয়ার করুন:
फॉलो अस
नवीनतम