পোস্টের কোড : 1770 10 পরিদর্শন

বাস্তবতার দর্পনে ওহাবি মতবাদ (২১)

২১পর্ব

২১পর্ব

ইবনে তাইমিয়ার চিন্তাধারার অন্যতম প্রচারক মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাব বলেছিলেন ' যারা ফেরেশতা, পয়গাম্বর এবং আল্লাহর অলিদের প্রতি তাওয়াসসুল করে এবং তাদেঁরকে নিজেদের শাফায়াতকারী হিসেবে চিন্তা করে কিংবা তাদেঁর ওসিলায় আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশা করে, তাদেরকে হত্যা করা বৈধ এবং তাদের মালামাল মোবাহ।" মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাব তার এই মনগড়া চিন্তাধারার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন এবং কোনোরকম প্রমাণপঞ্জী ছাড়াই নিজের বিচ্যুত চিন্তাধারাকে ইসলামের ধর্মীয় চিন্তা বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেনঃ ' ইসলাম সকল মাজহাব এ ব্যাপারে একমত যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং তার মাঝে তৃতীয় কাউকে মাধ্যম হিসেবে দাঁড় করাবে এবং ঐ মাধ্যমের কথা উল্লেখ করবে, সে কাফের এবং মুরতাদ,তার রক্ত হালাল এবং তার ধন-সম্পদ মোবাহ।"
 
নবীজীর প্রতি তাওয়াসসুল সম্পর্কে সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি শেইখ আব্দুল আযিয বিন আব্দুল্লা..আশ শেইখ মনে করেন, মৃত্যুর পর যেহেতু এই পৃথিবীর সাথে নবীজীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং কোনো কাজ করার শক্তি থাকে না, এমনকি কারো জন্যে দোয়া পর্যন্ত করতে পারে না, এককথায় সর্বপ্রকার কর্মশক্তি হারিয়ে ফেলেন, তাই অক্ষমের প্রতি তাওয়াসসুল করা বিবেক-বুদ্ধি অনুসারে বাতিল এবং শের্‌ক হবে।" ওহাবি আলেমরা চেষ্টা করছেন কেবল শিয়াদেরকেই নবীজী এবং তাঁর আহলে বাইতের সাথে তাওয়াসসুলকারী হিসেবে দেখাতে এবং তাদেরকে নিকৃষ্টতম কাফের হিসেবে সাব্যস্ত করতে। ওহাবিদের ফতোয়া জারির প্রধান কেন্দ্র সৌদি ইফতা পরিষদ শিয়াদের সাথে বিয়ের ব্যাপারে দেওয়া এক প্রশ্নের জবাবে ফতোয়া দিয়ে লিখেছেঃ শিয়া এবং কমিউনিস্টদের সাথে আহলে সুন্নাতের বিয়ে বৈধ নয় আর যদি বিয়ে হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে,কেননা শিয়ারা আহলে বাইতের প্রতি তাওয়াসসুলকারী, আর এটা মস্ত বড়ো শেরেকি।
 
অথচ ইহুদি খ্রিষ্টানদের সাথে বিয়ের ব্যাপারে তাদের দেওয়া ফতোয়া হলোঃ 'ইহুদি কিংবা খ্রিষ্টান যদি ব্যভিচারী না হয়ে থাকে তাহলে আহলে কিতাব হবার কারণে তাদের সাথে মুসলমানদের বিয়ে জায়েয।' এখানে আশ্চর্যজনক এবং দুঃখজনক বিষয়টি হলো এই যে ইসলামী পরিভাষায় আলেম নামধারীগণ ইহুদি নাসারার সাথে বিয়েকে বৈধ বলে মনে করে অথচ কোরআন এই দুই দলকে কাফেরদের সারিতে স্থান দিয়ে বলেছেঃ ইহুদীরা বলে ওযাইর আল্লাহ্ পুত্র এবং নাসারারা বলে 'মসীহ আল্লাহ্ পুত্র'। এ হচেছ তাদের মুখের কথা। এরা পূর্ববর্তী কাফেরদের মত কথা বলে। আল্লাহ্ এদের ধ্বংস করুন, এরা কীভাবে সত্য পথ থেকে বিচ্যুতির পথে চলে যাচেছ? শিয়াদের ব্যাপারে ওহাবিরা কুফুরির অভিযোগ এনে তাদের রক্তকে হালাল বলে ঘোষণা করলেও বাস্তবতা হলো এই যে,আল্লাহর একত্ব, নবী কারিম (সা) এর রেসালাত, কোরআনের প্রতি ঈমান, পরকালের প্রতি ঈমান ইত্যাদির মতো বিষয়গুলোর ব্যাপারে আহলে সুন্নাতের দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্বাসের সাথে শিয়াদের দৃষ্টিভঙ্গি এক ও অভিন্ন।
 
তাওয়াসসুল নিয়ে ওহাবিদের এ ধরনের চিন্তা আসলে একান্তই ভ্রান্ত। কেননা কোরআন এবং কোরআনের বর্ণনার সাথে পরিচিত সচেতন ব্যক্তিমাত্রই জানেন যে, তাওয়াসসুল তৌহিদের সাথে তো বৈপরীত্যময় কিংবা অসংলগ্ন নয় ই, বরং আল্লাহর দরবারে দোয়া করা এবং তাঁর নৈকট্য লাভের অন্যতম একটি উপায়ও বটে। প্রত্যেক মুসলমানই জানেন আল্লাহ তায়ালা একক এবং স্বাধীন সত্ত্বা। বিশ্বের সকল কিছুর মূলে রয়েছেন তিনি। বিশ্বের সকল আবিষ্কার-উদ্ভাবনী তাঁরই ইচ্ছায় কার্যকরী হয়। কোরআনে কারিমে রাসূলে খোদা (সা) কে সম্বোধন করে এ বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছেঃ 'আর যুদ্ধে যখন তুমি তীর নিক্ষেপ করেছিলে, আসলে তা তো তুমি নিক্ষেপ করো নি, বরং তা নিক্ষেপ করেছিলেন আল্লাহ স্বয়ং।' (সূরা আনফালঃআয়াত-১৭)
 
এ আয়াতে নবীজীর তীর নিক্ষেপের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে আল্লাহর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তার মানে ঐ তীর আল্লাহ এবং তাঁর পয়গাম্বর উভয়েই নিক্ষেপ করেছেন। এ আয়াতের মাধ্যমে সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে সকল কাজেরই মূল কর্তা হলেন আল্লাহ,তাঁর ইচ্ছাতেই সকল কাজ সংঘটিত হয়, এদিক থেকে নবীজী হলেন কাজের একটি মাধ্যম,বলা যায় কাজ সমাধা করার গৌণ মাধ্যম,মূখ্য নন,মূখ্য হলেন আল্লাহ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কেউ কলম দিয়ে কিছু একটা লিখলো। এখানে কলম হচ্ছে লেখার একটা মাধ্যম যা দিয়ে মানুষ লেখার কাজ করে থাকে। এখন কলম আর লেখক ব্যক্তিটিকে কি একই কাতারে দাঁড় করানো যায়? কিংবা এ দুয়ের মর্যাদা বা অবস্থান কি এক? দুঃখজনকভাবে ওহাবিরা তাওয়াসসুলকে শাফায়াতের মতোই ভুল বুঝেছেন। তারা মাধ্যমকে অদ্বিতীয় স্রষ্টার সাথে একই কাতারে শামিল করে ফেলেছেন। এ কারণেই তারা মুসলমানদেরকে মুশরিক বলে সাব্যস্ত করেছেন। অথচ তাওয়াসসুল মানে রাসূলে খোদা (সা) কে একক এবং অদ্বিতীয় আল্লাহর দরবারে পবিত্র একটি মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা বোঝায়, কোনোভাবেই আল্লাহর সাথে নবীজীকে শরিক করা বেোঝায় না।
 
আল্লাহর নৈকট্য লাভ ইবাদাত বন্দেগির পথে মানুষের সবোর্চ্চ সাফল্য। সূরা মায়েদার পঁয়ত্রিশ নম্বর স্পষ্ট করে বলা হয়েছে কোনো মাধ্যম ছাড়া আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যাবে না। বলা হয়েছেঃ"হে মুমিনগণ! আল্লাহ্কে ভয় কর,আল্লাহর আদেশের বিরোধিতা থেকে বিরত থাকো! তাঁর নৈকট্য লাভের জন্যে ওসিলা অন্বেষণ কর এবং তাঁর পথে জেহাদ কর যাতে তোমরা সফলকাম হও।" এই আয়াতে ঈমানদারদের সাফল্যের লক্ষ্যে তিনটি বিশেষ আদেশ দেওয়া হয়েছে। আদেশ তিনটি হলোঃ তাকওয়া এবং পরহেজগারী, আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার উদ্দেশ্য একজন ওসিলা অন্বেষণ করা এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করা। কিন্তু এ আয়াতে ওসিলা বলতে কী বোঝানো হয়েছে? এখানে আসলে ওসিলার অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক। তবে সর্বাবস্থাতেই এমন কোনো বস্তু কিংবা ব্যক্তিকে বোঝায় যা বা যিনি আল্লাহর নৈকট্য লাভের কারণ হবেন।
এখানে বস্তু বলতে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান, জিহাদ, নামায, রোযা, আল্লাহর ঘরের যিয়ারত, দান, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ইত্যাদিকেও বোঝায়, এগুলোর সবই আল্লাহর নৈকট্য লাভের ওসিলা হতে পারে। রাসূলে খোদা (সা), ইমামগণ, আল্লাহর নেক বান্দাগণের প্রতি তাওয়াসসুলও সে ধরনেরই ইবাদাতের শামিল, কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী যা আল্লাহর নৈকট্য লাভের কারণ হতে পারে। শ্রোতাবন্ধুরা! এ নিয়ে আরো কথা বলার ইচ্ছে রইলো পরবর্তী আসরে। আজ আর সময় নেই। যারা সঙ্গ দিলেন সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

0
সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে শেয়ার করুন:
फॉलो अस
नवीनतम