পোস্টের কোড : 1780 41 পরিদর্শন

বাস্তবতার দর্পনে ওহাবি মতবাদ (২৩)

২৩ তম পর্ব

২৩ তম পর্ব  

ইসলামে যিয়ারতের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। যিয়ারত মুসলমানদের ইবাদাতের কর্মসূচিগুলোর একটি। তাঁরা শাফায়াতের প্রতি বিশ্বাস অনুযায়ী তাওয়াসসুল এবং পূত-পবিত্র ব্যক্তিত্ববর্গের কবরের প্রতি সম্মান প্রদর্শনকে তর্কাতীত বিষয় বলে মনে করে। যদিও ইবনে তাইমিয়ারা নবীজীর কবর যিয়ারত করাকে হারাম বলে মনে করে। যাই হোক,বিষয়টি নিয়ে আমরা আজকের আসরে কথা বলার চেষ্টা করবো।
আগেকার দিনে হাজিগণ রাসূলে খোদার চাচা এবং ওহুদ যুদ্ধের শ্রেষ্ঠ শহীদ হামযা'র কবরের মাটি দিয়ে তাসবিহ তৈরি করতেন। হিজরি ষষ্ঠ শতাব্দির একজন বিখ্যাত কবি খাকানি শেরবানি রাসূলের নামকরা সাহাবি সালমানের মাযার যিয়ারতকারীদের উদ্দেশ্যে তাঁর লেখা একটি কবিতায় উপদেশ দিয়েছেন, সালমানের কবরের মাটি দিয়ে তাসবিহ তৈরি করতে, কেননা এই মহান সাহাবির কবরের পবিত্র মাটির একটা আধ্যাত্মিক মূল্য রয়েছে। তিনি লিখেছেনঃ
মক্কা থেকে সবাই নেয় হামযার কবরের মাটির তাসবিহ
তুমিও নাও মাদায়েন থেকে সালমানের কবরের তাসবিহ
এই ধরনের বক্তব্যের কারণে কোনো মুসলমান তো গোলোযোগ করতোই না বরং মক্কার অগ্রজেরা খাকানির কসিদাকে স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখতেন। কিন্তু সালাফিয়া মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা ইবনে তাইমিয়া নবীজী (সা) এর কবর যিয়ারত করাকে এমনকি যিয়ারত করার উদ্দেশ্যে সফর করাকেও হারাম বলে ঘোষণা করেছে।

ইবনে তাইমিয়া তার মিনহাজুস সুন্নাহ নামক গ্রন্থে কোনো দলিল প্রমাণ ছাড়াই লিখেছেনঃ "যিয়ারত সম্পর্কে নবীজীর যেসব হাদিসের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে সেগুলোর সবই মিথ্যা এবং বানোয়াট, ঐ হাদিসগুলোর সনদ সবই দুর্বল বা জায়িফ।"
ইবনে তাইমিয়া আরো বলেছেনঃ "নবীজী কিংবা অন্য কারো কবর যিয়ারত করার অর্থ হলো আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ডাকা এবং আল্লাহর সাথে অন্যকে শরিক করা,তাই এ ধরনের কাজ পুরোপুরি হারাম এবং শির্ক।"

যদিও নবীজী কিংবা বুযুর্গানে দ্বীনের কবর যিয়ারত করা হয় আল্লাহর কাছে তাদেঁর উচ্চ মর্যাদার কারণে,আল্লাহর সাথে তাদেঁরকে তুলনা করে নয়। ইবনে তাইমিয়া এবং ওহাবি ফের্কার প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহহাব শিয়াদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আরোপ করেছে যে, শিয়ারা তাদের ইমামদের মাযার যিয়ারত করাকে আল্লাহর ঘর কাবার হজ্ব করা থেকেও বড়ো বলে মনে করে।
মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহহাব "কাশফুশ শাবহাত" নামক বইতে নবী, আউলিয়া এবং আহলে বাইতের ইমামদের কবরের প্রতি শিয়াদের সম্মান প্রদর্শন করাকে অজুহাত বানিয়ে তাদেরকে শির্ক এবং বহু খোদায় বিশ্বাসী বলে অভিযুক্ত করেছেন। প্রকৃতপক্ষে ইবনে তাইমিয়া, মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহহাব এবং তাদের অনুসারীদের সবচে বড়ো একটি দুর্বলতা হলো নিজেদের জ্ঞানগত বিভ্রান্তি। তারা দ্বীন সম্পর্কে তাদের অপরিপক্ক জ্ঞান এবং বিচ্যুত মানদণ্ড দিয়েই অন্যদের শেরেকি বা একত্ববাদ বিচার করে থাকে। তারা দ্বীন সম্পর্কে তাদের ভুল উপলব্ধি, ভ্রান্ত জ্ঞান বা ধারণাকে অন্যদের আকিদা-বিশ্বাসের ওপর চাপিয়ে দেয়। অথচ কোরআনে কারিম, বিভিন্ন বর্ণনা এবং ইসলামী জ্ঞান সম্পন্ন নির্ভরযোগ্য আলেমদের ফতোয়া বা রায় ওহাবিদের চেয়ে ভিন্ন।
 

যিয়ারত সম্পর্কে স্বয়ং নবী করিম (সা) এর একটি হাদিস হলোঃ "বেশি বেশি কবর যিয়ারত করবে যাতে পরকালীন পৃথিবীর কথা মনে জাগে।" আরেকটি হাদিস এরকমঃ "কবর যিয়ারতে যাবে কেননা তার মাঝে তোমাদের জন্যে রয়েছে দৃষ্টান্তমূলক শিক্ষা।"
মানুষ কবর যিয়ারত করতে গেলে নিজেদের স্বাভাবিক দুর্বলতার বিষয়টি উপলব্ধি করে। বস্তুগত শক্তি সামর্থের নশ্বরতা খুব কাছে থেকে টের পায়। বিচক্ষণ মুসলমান যাঁরা তাঁরা কবর দেখে বুঝতে পারেন দ্রুত ক্ষীয়মান এই পার্থিব জীবনকে অবহেলায় কাটিয়ে দেওয়া ঠিক নয় বরং অনন্ত জীবনের পাথেয় সঞ্চয়ে সচেষ্ট হওয়া উচিত।
 
রাসূলে খোদা (সা) কিংবা তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের ইমামদের কবর যিয়ারতকালে যিয়ারতকারীগণ প্রকৃতপক্ষে তাদেঁর সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন যে, জীবনে তাদেঁর প্রদর্শিত পথ ছাড়া আর কোনো পথে পা বাড়াবেন না। নিঃসন্দেহে কবর যিয়ারত হচ্ছে রাসূলের সুন্নাত। অনেক হাদিস গ্রন্থে এসেছে রাসূলে খোদা (সা) মা আমেনার কবর যিয়ারত করতে গিয়ে কান্নাকাটি করতেন। আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলে খোদা (সা) তাঁর মায়ের কবর যিয়ারত করে নিজেও কেঁদেছেন এবং অন্যদেরকেও কাদিয়েঁছেন, তারপর বলেছেন... "কবরগুলোকে যিয়ারত করবে,কেননা কবর যিয়ারত করলে মৃত্যুর কথা মনে পড়ে।" সূরা তাকাসুরে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন একদল মুশরিকের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন যারা কবর যিয়ারত করতে গেছে কিন্তু শিক্ষা নেওয়ার জন্যে নয়। এই সূরার ১ এবং ২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ "আত্মগৌরব এবং প্রাচুর্যের লালসা তোমাদেরকে আল্লাহ থেকে দূরে রেখেছে। তোমরা কবর যিয়ারত করতে গেছো এবং তোমাদের মৃত ব্যক্তিদের কবরগুলো গুনেছো।" আল্লাহ মৃতদের সংখ্যা বা কবর গণনার মাধ্যমে গর্ব করাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন তবে তাদের যিয়ারত করাকে কোনোভাবেই নিষেধ করেন নি।

হিজরি সপ্তম শতাব্দির বিখ্যাত মুফাসসির মুহাম্মাদ কুরতাবি এই আয়াত দুটির ব্যাখ্যায় বলেছেনঃ "কঠিন হৃদয়গুলোর জন্যে কবর যিয়ারত হচ্ছে শ্রেষ্ঠতম ঔষধ। কারণ যিয়ারত তাদেরকে আখেরাত এবং মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেবে আর মৃত্যু ও আখেরাতের কথা স্মরণ হলে দুনিয়াবি চাওয়া পাওয়া হ্রাস পাবে এবং দুনিয়ায় থাকার আগ্রহ দূর হবে।"

নবীজীর কবর যিয়ারত সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়ার সামগ্রিক বক্তব্য থেকে কয়েকটি পয়েন্ট বেরিয়ে আসে। যেমন নবীজীর কবর যিয়ারত করা বেদআত এবং হারাম। যারা নবীজী কিংবা অপর কোনো নেককার বান্দার কবর যিয়ারত করার লক্ষ্যে সফরে বের হয়, তারা হারাম কাজের উদ্দেশ্যে সফরে বেরিয়েছে, তাদের উচিত তাদের নামায (কসর না করে) পূর্ণ করা। এ ধরনের সফরকে তিনি গুনাহের কাজ বলেও মনে করেন। ইবনে তাইমিয়ার এ ধরনের কথাবার্তা কেবল যে ভিত্তিহীন এবং বাতিল তাই নয় বরং বেয়াদবিপূর্ণও বটে।
 
ইবনে হাজার আসকালানিসহ বহু ফকিহ ইবনে তাইমিয়ার এসব বক্তব্য খণ্ডন করে রাসূলের বহু হাদিসের উদ্ধৃতিত দিয়ে গ্রন্থ লিখেছেন। এসব হাদিস ইবনে আব্বাস, আব্দুল্লা ইবনে ওমর, আনাস ইবনে মালিক, ইবনে আসাকিরের মতো নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের থেকে বর্ণিত হয়েছে। আনাস ইবনে মালিক থেকে বর্ণিত একটি হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করবো আজকের আলোচনা। নবী করিম (সা) বলেছেনঃ "যে-কেউ যিয়ারত করার উদ্দেশ্যে মদিনায় আসবে এবং আমাকে যিয়ারত করবে, কিয়ামতের দিন আমি তার জন্যে শাফায়াত করবো এবং তার পক্ষ্যে সাক্ষ্য দেবো।"

বলাবাহুল্য, নবীজীর অনেক সাহাবি এবং তাবেয়িন যুগ যুগ ধরে নবীজীর কবর যিয়ারত করার উদ্দেশ্যে সফর করেছেন। তাই রাসূলে খোদার কবর যিয়ারত করা হারাম-ইবনে তাইমিয়া কিংবা মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওহহাবের এরকম বক্তব্য মেনে নেওয়ার মানে হলো হালালকে হারাম বলে সাব্যস্ত করা,যা অনেক বড়ো গুনাহের কাজ। আল্লাহ আমাদেরকে দ্বীনের সঠিক উপলব্ধি দান করুন।

0
সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে শেয়ার করুন:
फॉलो अस
नवीनतम