পোস্টের কোড : 1886 9 পরিদর্শন

সৌদিতে নারী শ্রমিক নির্যাতন

সরকারের আগ্রহের বিষয়টা হয়তো অনুমান করা যায়। আসলে সরকারকে পাঠাতে হয়, না পাঠালে বিপদ আছে। বিষয়টি বুঝতে আমাদের একবার বিশ্বের শ্রমবাজারে উপস্থিতির দিকে তাকাতে হবে। পোশাক খাত বলে বলে আমরা যতই চিৎকার করি না কেন, আমাদের সবচেয়ে বড় কার্যকর আয় হয়ে থাকে প্রবাসীদের আয় থেকেই।

এক হিসাবে দেখা গেছে, চলতি (২০১৯-২০) অর্থবছরের এক আগস্ট মাসেই বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীরা ৩০৮ কোটি পাঁচ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে। এর পুরোটাই আয়, এখানে ব্যাক টু ব্যাক এলসির কোনো ফাঁকিজুকি নেই। এই যে বিপুল আয়, এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩১ কোটি ১০ লাখ ডলার, এসেছে সৌদি আরব থেকে। সৌদি আরবে বেতন-ভাতা যে খুব বেশি তা নয়। তবে দেশটি রক্ষণশীল হওয়ায় সেখানে নাগরিকত্ব পাওয়া বা বিনিয়োগ করা সহজ হয় না। ফলে সেখানে কর্মরত বাংলাদেশিরা যা কিছু আয় করে, তার প্রায় সবটাই পাঠিয়ে দেয় দেশে। 

তাছাড়া দেশটিতে বাংলাদেশির সংখ্যাও অনেক। সরকারি হিসাবেই আমাদের প্রায় ২০ লাখ পুরুষ কাজ করেন সৌদি আরবে। নারী শ্রমিকদের সঠিক কোনো হিসাব না পাওয়া গেলেও সংখ্যাটি একেবারে কম নয়। এর মধ্যে নারী শ্রমিক পাঠানো নিয়ে সৌদি সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের একটা চুক্তি হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছেÑ প্রতি দু’জন পুরুষ শ্রমিকের পাশাপাশি একজন নারী শ্রমিককে পাঠাতে হবে। অর্থাৎ একজন নারী শ্রমিককে পাঠালেই কেবল দুজন পুরুষ শ্রমিককে সৌদি আরবে পাঠানোর সুযোগ পাবে বাংলাদেশ।

স্বস্তির কথা হচ্ছে, এই নিয়মটি এখন আর সেভাবে পালিত হচ্ছে না। পালিত না হওয়া নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ তেমন কোনো আপত্তিও তুলছে না। তবে এখন তুলছে না বলে যে কখনোই তুলবে না, সেটাও বলা যায় না। আমরা নারী শ্রমিক পাঠাচ্ছি নাÑ এই প্রশ্ন তুলে তারা যদি পুরুষ শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করে দেয়, তাহলে আমাদের কিন্তু খুব কিছু বলার আর থাকবে না। হয়তো এই কারণেই এত অঘটন আর সমালোচনার পরও আমরা অনেকটা নিয়মিতই সৌদি আরবে নারী শ্রমিক পাঠাচ্ছি।

অনেকে এমনও দাবি তুলে থাকেন, সরকার কেন সৌদিতে নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করে দিচ্ছে না? এমন দাবির পিছনে আবেগ যতটা আছে যুক্তি হয়তো নেই ততটা। একটা কথা মনে রাখতে হবে, সৌদি আরবে নারী শ্রমিকের চাহিদা আছে। এখন সে দেশের মেয়েরাও চাকরির অনুমতি পাচ্ছে। ফলে সেখানে গৃহকর্মীর চাহিদা আগামীতে আরও বাড়বে। এমন সময় আমরা যদি নারী শ্রমিক পাঠানো একেবারেই বন্ধ করে দিই, তাহলে তারা যদি পাল্টা ব্যবস্থা হিসাবে আমাদের পুরুষ শ্রমিকদের ফেরত পাঠানো শুরু করে, অবস্থাটা কী দাঁড়াবে? এতে করে দেশের অর্থনীতিতে কতটা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, সেটা বুঝতে হিসাবে খুব বেশি পাকা হওয়ার দরকার পড়ে না। সে কারণেই মেয়েদের সৌদি আরবে পাঠানো একেবারে বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া সরকারের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব।

তাহলে কি এভাবেই চলতে থাকবে? আমাদের মেয়েদের এমন অপমান নীরবে সহ্য করে যেতে হবে? উভয় সংকটের এই জটিলতা থেকে বের হওয়ার কি কোনোই উপায় নেই?

এখানে একটি বিষয় খুবই লক্ষণীয়। নির্যাতিত হয়ে যে নারীই ফেরত আসছে, তাদের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় কমন পাওয়া যাচ্ছে, আর তা হলো ভাষাগত জটিলতা। ওরা আমাদের ভাষা বোঝে না, আমাদের নারী শ্রমিকরা ওদের ভাষা বুঝে না। একবার আপনার নিজের বাসার গৃহকর্মীর কথা ভাবুন তো। সে যদি আপনার কথা না বুঝে, পানি আনতে বললে সাবান নিয়ে এসে হাজির হয়, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার চালাতে বললে ওয়াশিং মেশিন ধরে টানাটানি শুরু করে, আপনার তখন কেমন লাগবে? আপনি কতদিন ধৈর্য ধরবেন? আমাদের দেশেই ধৈর্য হারিয়ে কেউ কেউ কি গৃহকর্মীদের গায়ে হাত তোলে না? এখানে যারা এমন নির্যাতন করে, আমরা হয়তো তাদের চিন্তা, রুচি ও মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলি। এরকম নিম্ন রুচির মানুষ তো সব দেশেই আছে। আমার কেন যেন মনে হয়, আমরা যদি এই নারী শ্রমিকদের ঠিকঠাক মতো প্রশিক্ষণ দিয়ে, কমপক্ষে ভাষাটা শিখিয়ে পাঠাতে পারতাম, তাহলে এমন নির্যাতনের ঘটনা অনেকটাই কমে যেতো। ইদানীং অবশ্য বিদেশে পাঠানোর আগে আমরা একটা প্রশিক্ষণ নিয়ম করেছি। তবে সেটা প্রকৃত অর্থে প্রশিক্ষণ কতটা হচ্ছে তা বলা কঠিন। কারণ প্রশিক্ষণটা হচ্ছে সরকারি ব্যবস্থাপনায়। যারা প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, তারাই পরীক্ষা নিচ্ছে। ফলে সব কিছুই হচ্ছে নামকা ওয়াস্তে। কিন্তু যদি এমন হতো যে, রিক্রুটিং এজেন্সি প্রশিক্ষণ দেবে এবং সরকার পরীক্ষা নেবে, কিন্তু এর বিপরীতটি হবে, তাহলে হয়তো কিছুটা সুফল পাওয়া যেতো। গৃহকর্মের প্রশিক্ষণ এবং ভাষাজ্ঞানটা ভালো হলে, ওখানে গিয়ে এই নারী শ্রমিকদের পক্ষে ভালো ভালো পরিবারে কাজ করার সুযোগ যেমন মিলতো, তেমনি বেতনও ভালো হতে পারতো।

তারপরও যে কিছু অঘটন ঘটবে না, তা বলা যায় না। তবে সেগুলোর দেখভালের জন্য সক্রিয় থাকতে হবে সৌদি আরবে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাসকে। সৌদি আরব থেকে যত নারী-পুরুষ নির্যাতন কিংবা প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে ফিরেছে, তাদের সকলের কণ্ঠেই শোনা গেছে আমাদের দূতাবাসের নেতিবাচক ভ‚মিকার কথা। কোনো সাহায্য তো দূরে থাক, এরা বরং বেশির ভাগ সময় বিপদে পড়া প্রবাসীদের কাছ থেকে নানাভাবে উৎকোচ আদায় করেছে। এই জায়গাটিতে পরিবর্তন আনতে হবে। এটা পুরোই সরকারের হাতে। সরকার চাইলেই এই কাজটা এখনই করতে পারে। প্রবাসীরা যখনই কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলবে, সঙ্গে সঙ্গে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তার তদন্ত করতে হবে। দোষী সাব্যস্ত হলে দিতে হবে কঠোরতম শাস্তি। একটি দুটি শাস্তি হলেই দেখা যাবে পাল্টে গেছে দৃশ্যপট।

এই যে এত নির্যাতনের ঘটনা শোনা যাচ্ছে, কোনো সৌদি গৃহকর্তার বিরুদ্ধে কি এ পর্যন্ত দূতাবাস থেকে কোনো অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে? কেন হয়নি? কারণ একটাই, দূতাবাসের কর্মকর্তারা এই নারী শ্রমিকদের নিয়ে ভাবেন না। তাদের চিন্তা কেবল নিজেদের শান-শওকত, বিলাসী জীবনযাপন, আর প্রবাসী শ্রমিকদের হয়রানি করার নানা ফন্দি-ফিকিরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ ওই দেশে কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হয় না বলেই এখানে ফিরে বিচ্ছিন্নভাবে যে যতই অভিযোগ করুন না কেন, ওই গৃহকর্তা কিন্তু আইনত ‘নিরপরাধ’ই থেকে যাচ্ছেন। দেখা যাবে, তার ঘরেই আবার অন্য কোনো বাংলাদেশি নারীকে পাঠানো হচ্ছে নির্যাতিত হতে।   

প্রতারিত নারী শ্রমিকদের বেশির ভাগই যখন তার দুর্ভোগের কথা বলেন, তখন তার শুরুটাই হয় দালাল আর এজেন্সিগুলোর কথা দিয়ে। তাই এদিকেও দিতে হবে কড়া নজর। কোথাও কোনো অনিয়ম পাওয়া মাত্র তার বিরুদ্ধে নিতে হবে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা। কেবল তাহলেই হয়তো আমাদের জনশক্তি খাতটিতে প্রত্যাশিত বিকাশ দেখা যাবে।

0
সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে শেয়ার করুন:
फॉलो अस
नवीनतम